December 08, 2021

ভালোবাসায় ডুবছে শহর

 

‘যতই আগুন জ্বলুক বুকে
আগুনই একা পুড়বে
হাসতে হাসতে কালো মেঘেরা    
বৃষ্টি হয়েই ঝরবে।’
 
বৃষ্টি বিন্দুরা জড়ো করে আনে ভালোবাসা, ঝরে পড়ে টুপটাপ শব্দে শহরের বুকে। এই প্রেম প্রকৃতির ককটেল উপভোগ করতে করতে- ভালোবাসায় ডুবছে শহর।   
 
‘ভালোবাসায় ডুবছে শহর’ মেঘমালা দে মহন্তের প্রথম কাব্য গ্রন্থ। যদিও মেঘমালা দে মহন্তর সাথে পাঠকের পরিচিতি একজন সফল গল্পকার হিসেবে। এবারে তিনি গল্প এঁকেছেন শব্দের ইঙ্গিতে নতুন আঙ্গিকে।
 
এই এক ফর্মার কাব্যগ্রন্থে রয়েছে ছাপান্নটি কবিতা। তবে এ কবিতাগুচ্ছ শুধু প্রেমের কবিতা নয়, অ-প্রেমের কবিতাও রয়েছে এই পনেরো পাতার মধ্যে।
 
তাই কখনো কবি লাজুক প্রেমিকা,  
 
‘হিসেব ভিজুক বেহিসেবি
পুড়ুক অঙ্ক দারুন জ্বরে
ছোট্ট একটা বৃষ্টি নামুক
নয়-জীবন জ্যামিতি ঘরে।’
 
    কখনো আবার রাত জাগা বিরহিণী,
 
‘ভাঁজ করা রাত-শাড়ি
পাট ভাঙে প্রহরে প্রহরে,
আর কত রানি হারায়
অতন্দ্র রাজপাট।’
 
    কবি মেঘমালার অস্তিত্বে কখনো ঢুকে পড়েছে গল্পকার মেঘমালার হাতছানি। কবি পাঠকের দু’চোখে বুনে দিয়ে যায় সাজানো দৃশ্যপট।
 
‘শীতের শব পড়ছে ঢাকা বসন্ত চাদরে
চাষী তুই আগলে রাখিস সোনালী উগার।’
 
‘অসহ্য সব জাগিয়ে রাখার আয়োজনে
বহুদিনের অতন্দ্র রাতটা কেঁদে ওঠে-
‘নাকছাবিটা হারিয়ে গেছে হলুদ সর্ষে বনে’ ’
 
কবি তাঁর চারপাশের দেখা প্রকৃতির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রোজনামচার খেলাগুলোকে তার কাব্যলিপিতে তুলে ধরেছেন। তাই বারে বারে কবিতায় ভেসে এসেছে কখনো কাল মেঘ, কখনো তারা ভরা  আকাশ। আর, তার মাঝে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে এক বৃক্ষ জীবন।
 
‘ধূলো-পা-জীবন সবুজে ঘুমাক
এপিটাফে এইটুকুই থাক।’
 
    এই কাব্যগ্রন্থের ছাপান্ন কবিতার কোন নাম নেই, নেই কোন ভাগ। সেই কারণেই কখনো একটা অগোছালো ছাপ পরিলক্ষিত হয়। রিফিউজি বা দেশপ্রেমের উল্লেখ যেন হঠাৎ করে এসে দাঁড়ায় স্বপনমেদুর কাব্যে। এক কবিতা থেকে আরেক কবিতায় হেঁটে যাওয়ার পথে তাই পাঠককে মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়াতে হয়। কবির পরবর্তী কাব্যগ্রন্থে তিনি নিশ্চয়ই এই পথ আরও মসৃণ করে দিবেন, আশা রাখি। প্রচ্ছদে লাল রঙের বেলুনটি ও হলুদ তীর  একটু চোখে লাগে, বিশেষত যখন বইটি টীন-এজ লাভ নিয়ে একেবারেই নয়।
 
    ‘ভালোবাসায় ডুবছে শহর’ – এক একান্ত দিন যাপনের কথা। কবি এখানে তার ভাবনাগুলো সাজিয়ে রেখেছেন পররম মমতায়। কিছু আবেগ, কিছু সুক্ষ মুহূর্ত যা রোজের জীবনে হয়তো হারিয়ে যায়, তাকেই তুলে এনেছেন এই দু’মলাটের মধ্যে। পাঠকের এই লেখার মধ্যে খুঁজে পাবেন মনের এলোমেলো চিন্তা কণাগুলো, আর এই কবিতাগুলো হয়ে ওঠে যেন আমাদেরই মনের কথা।
 
‘সারি সারি কিছু ঘুমন্ত মানুষ
কেউ জানেনি লোহার ব্যথা।
 
জেগে আছি আমি আর আমার দুরন্ত ট্রেন।’
 
    এই দুরন্ত ট্রেন পাঠক নিজের অজান্তেই উঠে পড়ে কামরায়, হারিয়ে যায় উইন্ডো সীটের ওই সবুজ মেঠো পথে কবির হতে হাত রেখে। ঠিক সেই সময় ভালোবাসা ঝরে পড়ে আকাশ থেকে। এখন শুধু শহরের সাথে পাঠকের ভালোবাসায় ডুবে যাওয়ার পালা।
 
 
বই              : ভালোবাসায় ডুবছে শহর
লেখিকা      : মেঘমালা দে মহন্ত
প্রকাশকাল : ২০২০   
প্রকাশক     : যাপনকথা প্রকাশনী 
প্রচ্ছদ         : রাজদীপ পুরী

April 12, 2021

প্রেমিকের বারোমাস্যা

 ‘তোমার শরীর জুড়ে ঘুরছে যে-হাত,

কখনো উত্তুঙ্গে আর অতলে চঞ্চল

হতে পারে সে এক মুগ্ধ পর্যটক

বেড়াতে এসেছে শুধু,থাকতে আসেনি।’

 

সত্যি প্রেম এক মুগ্ধ পর্যটক,নতুন আবিষ্কারে সে মোহিত হয়ে দু’চোখে চায়, বুক ভরে নিয়ে ফেরে এক অজানা পথকে নিজের চেনা ঠিকানা বানিয়ে। সেই পাওয়া না-পাওয়া প্রেম ও তার নানা রূপ নিয়ে হাজির কবি অভিজিৎ চক্রবর্তী তার এক ফর্মার বই ‘প্রেমিকের বারোমাস্যা’।


 

     আসলে কবিতা মানেই তীব্র প্রেম ও প্রতিটি কবি তার অবিচল প্রেমিক। সেই প্রেমিকের ভালোবাসার আর্তি ফুটে উঠেছে এই বইয়ের পাতা জুড়ে,বইয়ের মলাট হয়ে উঠেছে নরম লাল।

 

একটি সূত্রধর ও বাকি বারোটি কবিতা রয়েছে বারো মাসের প্রতিনিধি হয়ে এই প্রেমের রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে। বৈশাখের রবিঠাকুর, জৈষ্ঠের জামাই ষষ্ঠী থেকে চৈত্রের গাজন- কি নেই এই সন্মেলনে।

    

‘তারপর?-তারপর সেই অসমাপ্ত নিবেদন

খড় দহনে অঙ্কুরেই শুকিয়ে গেল।

আর ছেলেটা?- এখন সে গান শেখায়,

মূলত রবীন্দ্রসংগীত ।’

 

প্রেম মানে কিছুটা পাওয়া ও অনেকটা না পাওয়া। তাই কবি লিখছেন

 

‘... আপনি মহিলা কবি, যদি কোনোদিন

প্রেমিকের বারোমাস্যা লেখেন, জৈষ্ঠের এই জলকষ্ট

সবিস্তারে লিখবেন প্লিজ।’

 

      প্রেম আসবে আর বৃষ্টি আসবে না, তা কি সম্ভব? তাই আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র নিয়ে আসে ব্যর্থ প্রেমের কাদামাখা চপ্পল, পদ্মপুরাণ ও একটি গোলাপী ছাতা।  

 

‘তারপর হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে

সেই তীব্র গোলাপী ছাতাটা

ছেলেটার দিকে হেলতে থাকল

হেলতে হেলতে হেলতে

ওই  ওরা  শ্রাবণ পার হয়ে যাচ্ছে।’


প্রেম মানে আবেগ, প্রেম মানে প্রতীক্ষা, প্রেম মানে রোজকার জীবনের মাঝে একটু মন ছুঁয়ে থাকা।


 ‘নিয়ম করে চিঠি লিখত যারা

তারা জেনে গেছে, খাকি পোষ্টম্যান

পুরোনো ঠিকানায় আর তাহাকে পাবে না’

 

প্রেম আছে বলেই কার্ত্তিক এলে ঊল বোনার আবদার আছে, আছে পৌষের বনভোজনে মাফলার না পরার জন্যে বকুনি, আছে মাঘের মায়াবী রাতে আগুন আদর।

 

‘বিপুল কুয়াশায় ঢাকা

মাঘের মায়াবী রাত

পার হয়ে বসন্তের দিকে

যেতে যারা সংকল্প নিয়েছে,

তার জানে অন্তরে উষ্ণ না হলে

শীত সব গিলে খেয়ে ফেলে।’

 

     ‘প্রেমিকের বারোমাস্যা’ এক ভালোবাসার কাব্যকথা। তবু এখানে না পাওয়ার আর্তিকে কবি যেন বারবার ধরতে চেয়েছেন নানা আঙ্গিকে। এ যেন সেই মন খারাপের উদযাপন। প্রেমের উচ্ছল রূপটি এখানে খুব হালকা চলে ধরা পড়ে। বইটি হাতে ধরে পাঠকের অবশ্যই মনে পড়ে যাবে জীবনের হারানো পাতার মাঝে লুকিয়ে রাখা শুকনো গোলাপ প্রেম, খুঁজে পাবেন সেই প্রেম যে বেড়াতে এসেছে শুধু,থাকতে আসেনি।

 

 

 

বই        : প্রেমিকের বারোমাস্যা

কবি       : অভিজিৎ চক্রবর্তী

প্রকাশকাল    : ২০২০   

প্রকাশক     : যাপনকথা প্রকাশনী 

প্রচ্ছদ       : রাজদীপ পুরী

 

July 01, 2020

তোমাকে...

‘তোমাকে দেখেছি স্বপ্নের মুহূর্তে
তোমাকে দেখেছি প্রেমে-ভালোবাসায়
 
তোমাকে কখনো দেখেছি কি...’
 
     এক বিশাল ক্যানভাস জুড়ে কিছু কাগজ, রঙ, চুমকি, সুতো, পাথরকুচি, যা মনে আসে সব- ও একটু মন ও মেধা মেলালেই তৈরি হয় কোলাজ । নবীন কবি কোলাজ রায় তার সেই নামকেই মিশিয়ে তৈরি করেছেন এই কবিতা কোলাজ ‘তোমাকে...’
 
     কবির প্রথম বই, এক ফর্মার। মোট চোদ্দটি কবিতায় কবি সজিয়েছেন এক মায়াময় জগৎ। নবীন মনে অকাঙ্খিত প্রিয়জনের ছবি আঁকে শব্দ রঙের ছোঁয়ায়।
 
‘অকারণে শুধু হেঁটে যাই
মুখোমুখি পাই যদি পথে’
 
‘ধন্যবাদটুকুও দেওয়া হয়নি
কত কথার পরও দিইনি
শুধু কবিতায় লিখেছি। ’
 
     তবে প্রেম এমনই এক অনুভূতি যে সাথে ছায়ার মতো নিয়ে আসে বিরহকে। তাই কবি লিখছেন-
 
‘মিলনের শেষদিনে
পথ চলে যায় পথের উদ্দেশে
আমি শুধু হেঁটে যাই
বহু দূর চলে যাই...’
 
‘তুমি স্বপ্ন, আবার শব্দ হয়ে স্বপ্ন ভাঙো
স্বপ্নে আসো , তবু  থাকো মুখ লুকিয়ে।’
 
     কবি শুধু প্রেমকেই মেলে ধরেনি এই কাব্যভুবনে। এসেছে কিছু চাওয়া-পাওয়া, কিছু সংসারের সুখ ও অসুখ।
 
‘এখন পর্যন্ত ব্যর্থ আমি
তারপরও
সমর্পণ করিনি মৃত্যুর কাছে’
 
‘চিতাভস্মে পড়ে আছে পোড়া অলংকার
অন্তিম গন্তব্য শুধু
অলংকারের শেষ ঝঙ্কার’
 
     এই আমাদের ক্ষুদ্র জগৎ ও তার পাওয়া-না পাওয়ার হিসেবের মাঝেও কবি কিন্তু খুঁজে চলেছে প্রেম। যে প্রেমের কাছে সকল হতাশা, ইগো , দুঃখ সব দূর করে নিজেকে মেলে ধরা যায়।
 
‘বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি
স্তব্ধ শব্দ, স্তব্ধ কথা, স্তব্ধ লেখা
তোমার সামনে নতজানু
তোমাকে নিয়ে যত কবিতা।’
 
    

কবি শুনিয়ে গেছেন সমস্ত বিপদসংকুল রাস্তা পার করে অতিক্রম করা ভালোবাসার গন্তব্য- জীবনের এভারেস্ট পর্বতমালা, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার ভালোবাসার ঈপ্সিত মানুষ।
 
‘মুষল ধারায় বৃষ্টি আসুক
ঝড় হোক
ফিরবো না...’
 
‘রং চলে যায় আলোর সাথে
মনের রং জাগে সন্ধ্যার গায়ে
যেখানে কেবল আলো হয়ে
প্রতীয়মান শুধু তুমি। ’
 
     ‘তোমাকে...’ কাব্যগ্রন্থ মুলত ভালোবাসার কথা বলে, তার ধরা পড়া ও হারিয়ে যাওয়া তার রূপ-রং-বর্ণ, তার জীবন যাপন। বইটির কবিতা গোছানোয় একটু অগোছালো ভাব রয়েছে, তবে প্রথম প্রেম ও প্রথম বই – দুটোই মনের কাছের,ও মন চিরটাকাল এলোমেলো থাকতেই ভালোবাসে। কোলাজ রায়ের কলম থেকে আগামী দিনে আরো অনেক কবিতা পড়ার অপেক্ষায়। এখন সময় বইয়ের পাতা মেলার, আর মনে করার সেই মানুষটিকে, যাকে বলতে চেয়েছি কোনো এক বসন্তে- ভালবাসি ‘তোমাকে...’


 
বই                   : তোমাকে...
লেখক             : কোলাজ রায়
প্রকাশকাল      : ২০১৮   
প্রকাশক          : বাংলা সাহিত্য সমাজ, গুয়াহাটি   
প্রচ্ছদ              : নয়নজ্যোতি শর্মা


June 27, 2020

পোয়েটিক জানলায় কবিতার-মেঘ

‘এখন অন্ধকার চারিদিক

অথচ কিছু আগেও কলরব ছিল এই পথে

সকালের স্নিগ্ধ আলো পড়েছিল

ধূলি আলপনার উপর...’


এই নিগূঢ় অন্ধকার মনের প্যালেটে কথার ভীড় আঁকে, সেই কথারাই তো সাজে কবিতার মেঘ। মেঘেরা এসে আসর জমায় কবির জানলার কাঁচ ঘেঁষে। জন্ম নেয় ‘পোয়েটিক জানলায় কবিতার-মেঘ’। কবি নীলদীপ চক্রবর্তী তাঁর এই দু’মলাটের কবিতার বই জুড়ে পাঠকদের শুনিয়েছেন সেই সব মেঘেদের ফিসফাস কথা।

এই বইয়ের কবিতারা মনের কথা বলে। যে কথাদের সাজানো অলংকার চাই না সৌন্দর্যের খাতিরে। এ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তারাও হয়ে উঠেছে ঝকঝকে স্মার্ট।


‘প্রতি সন্ধ্যায় অর্ধেক চাঁদ নামে

নির্মীয়মান ফ্ল্যাট বাড়ির জলের পাইপ ধরে,

এর ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকবে তুমি...’

 

‘এখনো তোর অট্টালিকার রঙিন ডিস্টেম্পার

দেওয়ালের বদলে আকাশ, কালো জানলায়।’

 

     মানব মনের বিচরণ বড় অদ্ভুত। কি নেই সেখানে ! যৌবন – কৈশোর, প্রেম- বিরহ, জীবন- মৃত্যু, সব রঙের ককটেল। সেই ককটেলটি সুদৃঢ় কাঁচের গ্লাসে পরিবেশন করেছেন কবি।

 

‘প্রেম, তুমি কি রেলগাড়ি হতে পার,

ছোট্ট ছেলের কল্পনারই লোকে?’

 

‘হে যক্ষ, হে মেঘ, হে প্রেম

যত মৃত্যু সব

শেষবার জীবন হয়ে যাক।’

 

জীবন মানে শুধুই স্বপ্নসুখ নয়, জীবন মানে ঘোরতর বাস্তব ও তার চাওয়া পাওয়া। তাই কবির কলমে উঠে এসেছে কিছু খুঁজে বেড়ানো প্রশ্ন, কিছু না পাওয়া ইচ্ছেকুচি। কবিমন বার বার আঘাত হানে পাঠকের চেতনায়। বলে ওঠেন-

 

‘কোন অগ্নি, কোন বন্যা, কে ভাষায়

কে পোড়ায় – ভাষা মায়ের মৃত শরীর?’

 

‘বোবা কান্না মূল থেকে গভীর ধ্বনিতে

কন্ঠে যে ঈশ্বর আছেন নির্বাক বধির’

 

জীবন যাপনের খবর জানাতে কবি শোনায়-

 

‘আমরা কাটি পুরোনো কাস্তে দিয়ে

হেলে দুলে পড়া কালো কালো যহ ধান

আমরা কাটি দিন, কাটি রাত্রি-নিদ্রাহীন।’

 

     ‘পোয়েটিক জানলায় কবিতার-মেঘ’এর প্রচ্ছদটি যেমন জানলার গ্রীল জুড়ে দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশের জানান দেয়, এই বইটির কবিতাতেও উঠে এসেছে বিভিন্ন আঙ্গিক, বিভিন্ন রঙ, বিভিন্ন অভিব্যক্তি।উঠে এসেছে স্বপ্ন বিহার-

 

‘অষ্টমীর স্নানের মোহনায় ফুটে থাকে

বসন্ত কিশোরীর পদচিহ্ন।’

 

উঠে এসেছে কঠিন বাস্তব-

 

‘কারেংএর বিধৃত উপত্যকায় একা দাঁড়িয়েছে আহোম যুবক

ওর হেংদাং নিথর শুয়েছে খাপে...’

 

     পাঠক শুধু তুলে নেবে হাতে এবার, দু’চোখ ভরে দেখবে রামধনু- এক মেঘাচ্ছন্ন আকাশের বুকে।

 

বই       : পোয়েটিক জানলায় কবিতার-মেঘ 

লেখক      : নীলদীপ চক্রবর্তী

প্রকাশকাল : ২০১৯  

প্রকাশক    : নান্দীমুখ প্রকাশনী  

প্রচ্ছদ     : পুষ্পল দেব


May 29, 2020

চন্দ্রাহত



‘শিকড় ও মাটির ফাঁকে
গাঢ়তর জমে থাকে
চন্দ্রাহত বেদনা অপার...’

প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝে লুকিয়ে থাকা বেদনার রূপ হল কবি দেবলীনা সেনগুপ্তের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ - চন্দ্রাহত। এই বইয়ে কবি প্রকৃতির কোলে এঁকেছেন তাঁর যত্নে লালিত তেল সিঁদুরেরে সংসার।সেখানে কখনও ভিড় করেছে ভালবাসা, কখনও অজানার হাতছানি উপেক্ষা, কখনও বা না পাওয়া হতাশা বিন্দু। কবির লেখার চালে রয়েছে এক আটপৌরে ভাব। যেন মা মাসি রান্নাঘরে টুং টাং শব্দে ব্যস্ত, পোলাও কালিয়ার মাঝে গুঁজে দেয় স্নেহের কিসমিস। সকল ব্যর্থতারা কাঁচা আনাজে মিশে ছড়ায় সুবাস, রাঁধুনির মুখে গর্বের হাসি।

‘সন্মুখে একথালা জুঁইফুল ভাতের পাশে
সোনারং হাত বেরে দিত
পঞ্চব্যাঞ্জনের অমৃত কবিতা
শেষ পাতে একবাটি দুধে
সোহাগে গলে যেত খেজুর পাটালির কোমলতা’

     এ বই কবির হাতে গড়া সংসারকে বহন করে।তাই ঈশ্বর থেকে কবির বাবা, কেউ বাদ যাননি কবির চিন্তার পৃষ্ঠা থেকে। যেন কবির সকলের সাথে সাথে যুদ্ধ, নিজেকে খোঁজার যুদ্ধ। চারপাশের চোরাবালির মাঝে তলিয়ে যেতে কবির বড় অনীহা। তাই সে গর্জে ওঠে বারবার যেন বলে যেতে চায় তাঁর সাধারণের মধ্যে যে অসাধারণ রয়েছে তাকে খুঁজে বের করার দায় কবির নয়, আমাদের।

‘একা একা নারীর মতোই
ঈশ্বরের দুচোখে জল শুধু জল
ভালোবাসার এবং ভালোবাসতে না পারার...’

‘শস্যের পাশে লিখে রাখি ক্ষুধা ও আহার
মুঠোভরে তুলে নি
যখন যা মন
মুঠোখুলে দেখি যখন
শূন্য আকাশ শুধু মরুবালু রং...’

     চন্দ্রাহত বইটির প্রচ্ছদ ছবি হিসেবে সুন্দর কিন্তু বইটির সাথে সঙ্গতে একটু তাল চ্যুত মনে হয়েছে। কবিতাগুলো সাজানোয় কোথাও কোথাও একটু অগোছালো ছাপ, যেমন আটপৌরে কবিতার ঠিক পরেই স্বদেশের জয়গাঁথা একটু রসভঙ্গ করে। যেমন করে চেরাপুঞ্জির সৌন্দর্যে হারিয়ে পাঠক হঠাৎ রবীন্দ্রনাথকে দেখে হোঁচট খাবেন। কবি দেবলীনার সবে চলা শুরু এবং এসব ছোটো খাটো নুড়ি পাথর বেছে উনি ভবিষ্যতের রাস্তা সুদৃঢ় ও সুমসৃণ করবেন সুনিশ্চিত।

     সবশেষে এই বলা যায়, যে বইয়ের আমেজ কবি সঞ্জয় চক্রবর্তী তাঁর মুখবন্ধে বেঁধে দিয়ে যায় সুনিপুণ শব্দে সেখানে আর কিছু বলাটাই বাচালতা। শুধু মুখ বন্ধ করে ডুব দিতে হয় এক অমোঘ শব্দারণ্যে।

‘হাত ধরো, চলো যাই মিলে
অক্লান্ত পদাতিক মিছিলে’

‘পড়ে থাক নিছক রূপটান
শরতের সুধা নিয়ে
দেহমন্দিরে
বাজুক রূপগান


বই          : চন্দ্রাহত  
লেখিকা       : দেবলীনা সেনগুপ্ত
প্রকাশকাল    : ২০১৬
প্রকাশক      : ভিকি পাবলিশার্স
প্রচ্ছদ        : শুভজিত পাল




প্রকাশিত ' মে'খানা - শুধু কবিতার ' পত্রিকায়, পঞ্চম প্রকাশ, মে, ২০১৯  ( গুয়াহাটি, অসম )

More to see...